ঢাকা (কমলাপুর) থেকে রাজশাহী রুটে নিয়মিত ৪টি প্রধান আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে: ধূমকেতু এক্সপ্রেস (সকাল ০৬:০০), বনলতা এক্সপ্রেস (দুপুর ০১:৩০), সিল্কসিটি এক্সপ্রেস (দুপুর ০২:৩০), এবং পদ্মা এক্সপ্রেস (রাত ১০:৪৫)। গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগে গড়ে ৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট থেকে ৬ ঘণ্টা। এই রুটে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৪০–৪৫০ টাকা এবং স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) ক্লাসের ভাড়া ৬৫৬–৮২০ টাকা। বনলতা এক্সপ্রেস হলো এই রুটের একমাত্র বিরতিহীন (নন-স্টপ) দ্রুতগামী ট্রেন।
ঢাকা থেকে সিল্কসিটি রাজশাহীতে যাতায়াতের জন্য রেলপথ যাত্রীদের প্রথম পছন্দ। সড়কপথের যানজট এড়িয়ে সময়মতো ও নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য হাজারো যাত্রী প্রতিদিন এই ট্রেনগুলোর ওপর নির্ভর করেন। নিচে ট্রেনের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচী, আসনভিত্তিক ভাড়ার তালিকা, ছুটির দিন এবং প্রধান যাত্রাবিরতি স্টপেজগুলোর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো।
ঢাকা টু রাজশাহী ট্রেনের সময়সূচী
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর নির্ধারিত সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নম্বর | ঢাকা ছাড়ার সময় | রাজশাহী পৌঁছানোর সময় | সাপ্তাহিক বন্ধের দিন (Off Day) |
| ধূমকেতু এক্সপ্রেস | ৭৬৯ | সকাল ০৬:০০ মি. | সকাল ১১:৪০ মি. | বৃহস্পতিবার |
| বনলতা এক্সপ্রেস | ৭৯১ | দুপুর ০১:৩০ মি. | বিকাল ০৫:৪৫ মি. | শুক্রবার |
| সিল্কসিটি এক্সপ্রেস | ৭৫৩ | দুপুর ০২:৩০ মি. | রাত ০৮:২০ মি. | রবিবার |
| পদ্মা এক্সপ্রেস | ৭৫৯ | রাত ১০:৪৫ মি. | ভোর ০৪:০০ মি. | মঙ্গলবার |
| মধুমতি এক্সপ্রেস (পদ্মা সেতু হয়ে) | ৭৫৫ | দুপুর ০৩:০০ মি. | রাত ১০:৩০ মি. | শনিবার |
নোট: রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অপারেশনাল প্রয়োজনে বা সিজনাল কারণে সময়ের সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। যাত্রা শুরুর পূর্বে টিকিটে উল্লেখিত সময় দেখে নেওয়া নিরাপদ।
কোন ট্রেনের বৈশিষ্ট্য কেমন?
ঢাকা-রাজশাহী রুটে চলাচলকারী প্রতিটি ট্রেনের সময় ও সেবার ধরনে কিছু নিজস্ব পার্থক্য রয়েছে:
বনলতা এক্সপ্রেস (৭৯১) – দ্রুততম নন-স্টপ ট্রেন
সবচেয়ে কম সময়ে রাজশাহী পৌঁছানোর জন্য বনলতা এক্সপ্রেস সেরা পছন্দ। এটি আধুনিক বায়ো-টয়লেট যুক্ত অত্যাধুনিক বগি দিয়ে পরিচালিত। ট্রেনটি ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনের পর যমুনা সেতু পার হয়ে সরাসরি রাজশাহী পৌঁছে যায়, মাঝে কোনো স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা করায় না। মাত্র ৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টায় এই ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছায়। বনলতা এক্সপ্রেসের টিকিটের সাথে খাবার বাধ্যতামূলক থাকে, তাই টিকিটের মোট মূল্য কিছুটা বেশি হয়।
সিল্কসিটি এক্সপ্রেস (৭৫৩) – দিনের জনপ্রিয় যাত্রা
দুপুরের খাবারের পর যারা যাত্রা শুরু করে রাতের খাবারের আগেই রাজশাহী পৌঁছাতে চান, তাদের জন্য সিল্কসিটি এক্সপ্রেস দারুণ। উত্তরবঙ্গের অন্যতম পুরোনো এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আন্তঃনগর ট্রেন এটি। পরিবার বা বয়োজ্যেষ্ঠদের নিয়ে ভ্রমণের জন্য এই ট্রেন বেশ আরামদায়ক।
পদ্মা এক্সপ্রেস (৭৫৯) – রাতের শান্ত ভ্রমণ
পদ্মা এক্সপ্রেস মূলত রাতের ট্রেন। চাকরিজীবী বা পরীক্ষার্থীদের জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর, কারণ সারাদিন ঢাকায় কাজ শেষ করে রাতে ট্রেনে উঠে ভোরে রাজশাহীতে নেমে যাওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত সময় ও হোটেল খরচের প্রয়োজন হয় না।
ধূমকেতু এক্সপ্রেস (৭৬৯) – সকালের স্নিগ্ধ যাত্রা
ভোরবেলা রওনা দিয়ে দুপুর নাগাদ রাজশাহী পৌঁছাতে চাইলে ধূমকেতু এক্সপ্রেস বেছে নিন। দিনের আলোয় যমুনা সেতুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাত্রা করার দারুণ সুযোগ থাকে এই ট্রেনে।
ঢাকা টু রাজশাহী ট্রেনের ভাড়ার তালিকা
বাংলাদেশ রেলওয়ে নির্ধারিত দূরত্ব এবং আসন শ্রেণির সুবিধা অনুযায়ী ট্রেনের ভাড়ার হার নির্ধারণ করে। নিচে ১৫% ভ্যাটসহ ঢাকা টু রাজশাহী রুটের প্রতিটি আসন শ্রেণির ভাড়ার তালিকা দেওয়া হলো:
| আসন শ্রেণি (Seat Class) | সাধারণ ট্রেন ভাড়া (ধূমকেতু/পদ্মা/সিল্কসিটি) | বনলতা এক্সপ্রেস (খাবার ফি সহ) |
| শোভন চেয়ার (Shovon Chair) | ৩৪০ – ৩৫০ টাকা | ৪৩০ – ৪৫০ টাকা |
| স্নিগ্ধা / এসি চেয়ার (Snigdha) | ৬৫৬ – ৬৬০ টাকা | ৭৮০ – ৮২০ টাকা |
| এসি সিট (AC Seat) | ৭৮২ – ৭৯০ টাকা | — |
| এসি বার্থ / কেবিন (AC Berth) | ১১৭৩ – ১২০০ টাকা | — |
অনলাইন টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যাংক গেটওয়ে বা প্রসেসিং ফি বাবদ প্রতি টিকিটে ২০ টাকা সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়।
ট্রেনের প্রধান যাত্রাবিরতি বা স্টপেজসমূহ
নন-স্টপ বনলতা এক্সপ্রেস ছাড়া অন্যান্য ট্রেনগুলো ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে যাত্রাবিরতি দেয়:
- ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন (উত্তরা ও টঙ্গীর যাত্রীদের জন্য প্রধান ওঠানামার পয়েন্ট)
- জয়দেবপুর জংশন (গাজীপুর এলাকার যাত্রীদের জন্য)
- মির্জাপুর ও টাঙ্গাইল স্টেশন
- বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব ও বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম জংশন
- শহীদ মনসুর আলী ও উল্লাপাড়া স্টেশন
- বড়ালব্রিজ ও চাটমোহর স্টেশন
- ঈশ্বরদী বাইপাস জংশন (পাবনা ও পার্শ্ববর্তী জেলার সংযোগস্থল)
- আব্দুলপুর জংশন (নাটোর জেলার গুরুত্বপূর্ণ রেল পয়েন্ট)
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার সহজ নিয়ম
- অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ: প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল পোর্টাল
eticket.railway.gov.bdঅথবা "Rail Sheba" অ্যাপে প্রবেশ করুন। - লগইন: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।
- রুট ও তারিখ নির্বাচন: From অপশনে "Dhaka" এবং To অপশনে "Rajshahi" লিখুন। যাত্রার তারিখ এবং পছন্দের ক্লাস (Shovon Chair বা Snigdha) সিলেক্ট করে "Find Ticket" বাটনে চাপ দিন। (যাত্রার ১০ দিন আগে সকাল ০৮:০০ টায় পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনের অনলাইন টিকিট উন্মুক্ত হয়)।
- সিট সিলেক্ট ও পেমেন্ট: পছন্দমতো সিট নম্বর বেছে নিয়ে বিকাশ, নগদ, রকেট বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
- টিকিট ডাউনলোড: পেমেন্ট সম্পন্ন হলে অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল টিকিট চলে আসবে। প্রয়োজনে টিকিটের প্রিন্ট কপি সঙ্গে রাখা ভালো।
রাজশাহী ট্রেন ভ্রমণের কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ
- স্টেশনে সময়মতো পৌঁছানো: ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে স্টেশনে উপস্থিত থাকুন। বিশেষ করে ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেনের যাত্রাবিরতির সময় মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিট থাকে।
- সঠিক এনআইডি ব্যবহার: অন্যের এনআইডি দিয়ে কেনা টিকিট নিয়ে ভ্রমণ করা আইনত দণ্ডনীয়। নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কাটা টিকিট বহন করুন এবং ট্রেনে তল্লাশির সুবিধার্থে মূল এনআইডি কার্ড বা ফটোকপি সাথে রাখুন।
- মালামাল সুরক্ষা: ভিড়ের সময়ে মোবাইল, ওয়ালেট ও প্রয়োজনীয় ব্যাগ নিজের কাছে রাখুন। রাতের ট্রেনে ঘুমোনোর সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করুন।
ঢাকা থেকে রাজশাহী রুটে ট্রেন ভ্রমণ শুধু ক্লান্তিহীন ও আরামদায়কই নয়, বরং সড়কপথের অতিরিক্ত ভাড়া এবং জ্যামের অনিশ্চয়তা এড়ানোর সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম। সময় বাঁচিয়ে দ্রুত পৌঁছাতে চাইলে বনলতা এক্সপ্রেস এবং সাশ্রয়ী ভাড়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবারের সাথে যেতে চাইলে সিল্কসিটি বা পদ্মা এক্সপ্রেস হতে পারে সেরা পছন্দ। যেহেতু এই রুটে যাত্রীদের চাপ সবসময় বেশি থাকে, তাই ঝামেলাহীন ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত যাত্রার অন্তত কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকিট নিশ্চিত করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সঠিক সময়সূচী মেনে চলুন এবং আপনার যাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক।
Comments
No comments yet. Be the first to ask a question or share an update.
Leave a comment
Your mobile number is never published. Comments appear after review. Website links, email addresses and code are not allowed.